দন্ডীপাক


    ঘড়ির কাঁটাটা তখন সবে আটটার ঘরে ঢুকেছে। তিষামের ঘুম ভাঙলো। মাথাটা হালকা ধরে আছে। কিন্তু... তিষাম এই ঘরে এলো কী করে? বিছানা থেকে নেমে টলমল পায়ে তিষাম ঘরের বাইরে এলো। ডাইনিং টেবিলে ব্রেকফাস্ট সাজিয়ে বসে আছে মাঝবয়সি এক ভদ্রলোক ।
-কে আপনি ? আর আমি এখন কোথায়?
-আমি অর্ণব। তোমার স্বামী। এটা আমাদের বাড়ি...
-কিন্তু আমি... আমার তো কিছু মনে পড়ছে না ...
-আজ থেকে আট বছর আগে একটা অ্যাক্সিডেন্টে তোমার মাথায় আঘাত লাগে। তারপর থেকেই তোমার ভুলে যাওয়া শুরু হয়। তোমার শুধু একদিনেরই কথা মনে থাকে আর পরদিন সকালে তুমি সেটাও ভুলে যাও।তাই মনে করতে পারছো না....
-কিন্তু...
-( তিষামের কপালে একটা চুমু এঁকে) এবার আমি আসি। নাহলে অফিসে দেরি হয়ে যাবে। নিজের খেয়াল রেখো ...

             অর্ণব বেরোনোর সাথে সাথেই তিষামের ফোনে রিমাইন্ডারটা বেজে ওঠে। বিকালে ডক্টর রয় এর কাছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট  আছে। ব্রেকফাস্ট করে নিয়ে তিষাম ওদের বিয়ের অ্যালবাম খুঁজতে বসে যায়। কিন্তু কোনো অ্যালবামই খুঁজে পেলো না তিষাম। শুধু স্টাডি টেবিলের ওপর দেওয়ালে লাগানো তিষাম আর অর্ণবের কিছু ছবি।

(বিকালে ডক্টর রয় এর চেম্বারে)
-এখন কেমন আছো তিষাম?
-ভালো না। আমি কিছুই মনে রাখতে পারছি না।
-আচ্ছা তুমি এই ক্যামেরাটা তোমার কাছে রাখো। এতে তোমার সাথে সারাদিন যা যা হচ্ছে রেকর্ড করে রাখবে। আমি তোমায় প্রত্যেক দিন সকালে ফোন করে মনে করাবো আগের দিনের রেকর্ডিং দেখার কথা।
-ধন্যবাদ...

               এরপর প্রত্যেক দিনই তিষাম ক্যামেরায় সব রেকর্ড করে রাখতে লাগলো। আর ডক্টরও রোজ মনে করিয়ে দিত রেকর্ডিং এর কথা।আস্তে আস্তে ডক্টর তিষামের বন্ধু হয়ে উঠছিল।
              তিষামের প্রায়ই কিছু কিছু ঘটনা মনে পড়তো। একদিন হঠাৎই তিষামের চোখের সামনে কিছু দৃশ্য ভেসে উঠলো। তিষামের মনে পড়ে গেল ওর এক ছেলেও ছিল। তিষাম সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে অর্ণবকে জিজ্ঞাসা করতে শুরু করলো। অনেকবার জিজ্ঞাসা করার পর অর্ণব বলতে বাধ্য হলো তাদের এক ছেলে ছিল অপূর্ব। অপূর্বের এক কঠিন রোগ হওয়ায় পাঁচ বছর বয়সেই মারা যায়। আর এই কথা মনে করিয়ে তিষামকে কষ্ট দিতে চায়নি বলেই চেপে গেছিল ব্যাপারটা।

                 তিষামের শরীর আস্তে আস্তে আরো খারাপ হতে থাকে। ওর স্বপ্নে কিছু কিছু দৃশ্য ভেসে উঠতে থাকে। বারবার উজান নামটা দেখতে পায় তিষাম। আর দেখতে পায় একজন ওর মাথায় মারছে কিন্তু তার মুখটা আবছা।
                  পরের অ্যাপয়েন্টমেন্টে তিষাম ডক্টর রয় এর চেম্বারে যায়। সব বলার আগেই তিষামের চোখ পড়ে ডক্টরের আই-কার্ডে লেখা ডক্টর উজান রয়। তিষামের মনে হয় স্বপ্নে দেখা ব্যক্তিটি ডক্টর রয়। তিষাম ভয় পেয়ে চেম্বার ছেড়ে বেড়িয়ে আসে। পরে বাড়িতে এসে নিজের ভুল বুঝতে পারে তিষাম। একই নামের দুজন থাকতেই পারে। তিষাম ডক্টরকে ফোন করে ক্ষমা চায় এবং সব কিছু খুলে বলে। তখন ডক্টর তিষামকে মনে করানোর চেষ্টা করেন তার আর তিষামের প্রথম আলাপের কথা। তিনি বলেন তিনি প্রথম তিষাম দেখেছিলেন মেন্টাল হসপিটালে।তিনি হসপিটালে খোঁজ নিয়ে জেনেছিলেন অর্ণব তিষামকে ডিভোর্স দিয়ে মেন্টাল হসপিটালে রেখে যায়। তারপর থেকে প্রথম কয়েক মাস তিষামের বন্ধু সোহিনী প্রায়ই ফোন করে তিষামের খোঁজ নিত। এরপর ডক্টর রিসার্চের জন্য বাইরে চলে যান। ফিরে এসে জানতে পারেন তিষাম নিজের বাড়ি ফিরে গেছে। এরপর হসপিটাল থেকে তিষামের নম্বর নিয়ে যোগাযোগ করেন আর বিগত পাঁচ বছর ধরে তিষামের চিকিৎসা উনিই করছেন। তিষামের মনে পড়ে যায়। এরপর ডক্টর রয় তিষামকে সোহিনীর নম্বর দেন যাতে পুরানো বন্ধুর সাহায্যে কিছু স্মৃতি ফিরে পায় তিষাম।
                   তিষাম সোহিনীর নাম্বার নিয়ে ফোন করে দেখা করতে বলে। সোহিনীর সাথে দেখা করে জানতে পারে তিষামের মাথায় আঘাত লাগার পর থেকে তিষাম রোজ ভুলে যেত। অপূর্ব তখন অনেকটাই ছোটো ছিল। ওর পক্ষে মায়ের রোগ বোঝা সম্ভব ছিল না। ফলে ও কিছু জিজ্ঞাসা করলেই তিষাম রেগে যেত। কখনো কখনো অপূর্বের গায়ে হাতও তুলতো। আস্তে আস্তে অপূর্বের মনে ভয় তৈরি হয়। তাই বাধ্য হয়ে অর্ণব ওকে ডিভোর্স দিয়ে মেন্টাল হসপিটালে দিয়ে আসে। এরপর সোহিনী অপূর্বের দেখাশোনা করতো। কিন্তু এক বছর পর অর্ণব ছেলেকে নিয়ে বিদেশে চলে যায়। তিষামের সব কিছু কেমন গুলিয়ে যায়। এমন সময় তিষামের ফোন বেজে ওঠে। স্ক্রিনে অর্ণবের নাম।অর্ণব তিষামকে বলে আজ তাদের বিবাহবার্ষিকী তাই তিষাম যেন সন্ধ্যেবেলা তৈরি থাকে। অর্ণব গাড়ি পাঠিয়ে দেয়। গাড়ি তিষামকে সেই হোটেলে নামায় যেখানে আট বছর আগে তিষামকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল।

-আপনি আসলে কে? আপনি অর্ণব হতে পারেন না ঋ
-ঠিক বলেছো। আমি উজান। অর্ণবের অভিনয় করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। মনে পড়ছে কিছু?
 
(আস্তে আস্তে তিষামের সব মনে পড়ে যায়। তিষামের সাথে উজানের বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ছিল। আট বছর আগে ওরা দুজন এই হোটেলেই এসেছিল। সেদিন উজান তিষামকে বলেছিল অর্ণবকে সব বলে দিতে। কিন্তু তিষাম রাজি হয়নি। তখন উজান রেগে গিয়ে তিষামের উপর হামলা করে। মাথায় মারার জন্যই আজ তিষামের এই অবস্থা)

-তাহলে তুমিই সেদিন...
-হ্যাঁ আমিই ... (তিষামের থেকে ক্যামেরা নিয়ে সব রেকর্ডিং ডিলিট করে দেয়)  তোমাকে তো অর্ণব মেন্টাল হসপিটালে রেখে এসেছিল। সেখান থেকে আমিই তোমাকে নিয়ে আসি। তারপর থেকে নিজের অস্তিত্ব ভুলে অর্ণব হয়ে আছি তোমার সাথে। আমি তোমায় খুব ভালোবাসি ....
-আমাকে যেতে দাও।
-না। হয় এখান থেকে দুজন একসাথে বেরোবো নাহলে কেউ বেরোবো না ...

                         এরপর দুজনের মধ্যে আবার ধস্তাধস্তি শুরু হয়। কিন্তু এবারে তিষাম উজানকে ঠেলে ফেলে দেয়। মাথায় লেগে উজান অজ্ঞান হয়ে যায়। সেই সুযোগে তিষাম পালিয়ে যায়। পার্কিং লটে একটা গাড়িতে উঠে পড়ে। সাথে ছিল ক্যামেরা। তিষাম ওর পুরো ঘটনা রেকর্ড করে। পরের দিন যখন চোখ খোলে তিষাম তখন দেখে হসপিটালের বেডে শুয়ে আছে আর সামনে বসে আছে ডক্টর উজান রয়।
-এখন কেমন লাগছে তিষাম?
-ভালো ...
-তোমার অপরাধী ধরা পড়েছে। আর তোমার জন্য আরেকটা সারপ্রাইজ আছে।

                       তিষাম দেখলো ওর কেবিন ঢুকছে দুজন। ডক্টর পরিচয় করিয়ে দিল " এই যে তোমার স্বামী অর্ণব আর তোমার ছেলে অপূর্ব।এক ফোনেই দেশে ফিরেছে শুধু তোমার জন্য।" তিষামের চোখে তখন খুশির জল ..


Comments

  1. Prochondo sundor plot... Amar bujhteo bes khanikkhon laglo... Fatafati laglo... Keep it up

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

পুরানো ছন্দে নতুন গোয়েন্দাগল্প

মুক্তি

ফুলমণি