ফুলমণি
ঘড়ি তখন জানান দিচ্ছে রাত এগারোটা বেজে গেছে। একচালা ঘরটার সামনে রিক্সাটা দাঁড়ালো। সারাদিনের ক্লান্তির পর মানুষটা ঘরে ফিরলো। হাতটা আঁচলে মুছে কুঁজো থেকে গ্লাসে জল ঢেলে এগিয়ে দিলো ফুল।
-কি রান্না করেছিস ফুল?- বাড়িতে তো কিছুই নেই। তাই চালে ডালেই করেছি।
-তুই দুপুর বেলা খেয়েছিলিস?
- হ্যাঁ ও পাড়ার মন্দিরের বাইরে ভিখারিদের খাওয়াচ্ছিল। তোর জন্য একটু নিয়ে এসেছি। হাত মুখ ধুয়ে আয় ...
-এনে আজকের পঞ্চাশ টাকা।
-পঞ্চাশ টাকায় কি হয় রবি? তুই যখন রোজগার করতে পারবিই না তাহলে আমায় বিয়ে করলি কেন?
-টোটোর যুগে রিক্সায় কে উঠবে বল? আমি কাল আরও দূরে যাবো। যে করে হোক টাকা রোজগার করে আনবো। তুই শুধু পাশে থাক ফুল, আমরা ঠিক ভালো থাকবো ...
রবি ফুলের হাতটা ধরতেই ফুল হাতটা ছাড়িয়ে খাবার আনতে চলে গেল। আজ রাতে বোধহয় দুটো শরীর তো দূর মন দুটোও একে অপরকে ছুঁতে পারবে না...
***********************************************
-তুই আজ ও লেট অভি?
-সেই তো সব শেষই হবে একদিন। তাড়াতাড়ি আসি বা দেরি করে আসি...কি যায় আসে?
-তোর তাহলে কিছু যায় আসেনা বলছিস?
-দেখ বেকার কথার জটিলতা বাড়াস না...
-আমি পরশু চলে যাচ্ছি। আর তোকে কষ্ট করে দেখা করতে আসতে হবে না। জোর করে ফোনে কথা বলতে হবে না। আমার হাতটাও ধরতে হবে না। জোর করে বলতেও হবে না "ভালোবাসি" আর জোর করে ভালোবাসতেও হবে না...
-আমি তো তোকে শুরুতেই বলেছিলাম আমি তোর ঐ গল্প গুলোর প্রেমিকদের মতো হতে পারবো না।
-হ্যাঁ আমারই ভুল, ভেবেছিলাম ভালোবাসা দিয়ে তোর পাথর মনটা গলে যাবে ...
-ছাড় যা হয় ভালোর জন্যই হয় মোহর। নতুন চাকরি পেয়ে বাইরে চলে যাচ্ছিস এর থেকে ভালো কি হতে পারে?
-লং ডিসটেন্স রিলেশনশিপ কি রাখা যায় না?
-না ...
***********************************************
-দরজা খোল ফুল ...
-একি? কি অবস্থা করেছিস নিজের?
- রমেশের মুখ ভেঙে দিয়ে এলাম। শালার কতো বড়ো সাহস ...
-কী হয়েছে?
-বলছিল "তোর মাগীটা তো দিন দুপুরে মাগীবাজী করছে। কত টাকা চার্জ নেয় জিজ্ঞাসা করিস তো"
-শান্ত হ্।
- ওর সাহস কি করে হলো তোকে মাগী বলার!!
- মাগীকে মাগী বলবে না তো কি বলবে? আমি তো মাগীই ছিলাম। তুইই তো আমায় সোনাগাছি থেকে নিয়ে এলি। তা বলে কি অতীতের দাগ মুছে যাবে?
-খেতে দে।খিদে পেয়েছে...
- বস। আজ মাছ রেঁধেছি তোর জন্য।
-মাছ কেনার টাকা কোথায় পেলি?
- অত জানতে হবে না। শান্তি করে খা তো।
অনেক দিন পর রবি তৃপ্তি করে মাছ ভাত খেলো। রাতে রবি আবার আগের মতো ফুলকে আদর করলো তবু কেন জানি না সেই আদরে ফুলের ব্যাথা গুলো আরও বেড়ে গেল ...
***********************************************
- কী নাম তোমার?
- আমাদের ব্যাবসায় নাম বলতে নেই। যা করতে এসেছিস করে চলে যা।
- আমার বেশি কিছু চাই না। তোমার কোলে মাথা রেখে একটু শুতে দেবে? একটু শান্তিতে ঘুমোতে চাই ...
- মনে হচ্ছে নতুন। শুধু ঘুমোতে কেউ আসে না এখানে । আমাদের কাছে সবাই শরীর ভোগ করতে আসে। তা কি করিস তুই?
- আমি অভি। ঐ সস্তার লেখক।
- এখানে এলি কেন?
- একটু শান্তির খোঁজে। কেউ দাম দেয় না আমার। কেউ দাম দেয় না আমার লেখার । কেউ দাম দেয় না আমার ভালোবাসার। সবাই ভাবে আমার মনটা পাথরের ... আমি ভালোবাসতে জানি না...
- এদিকে আয়, কোলে মাথা রাখ ... আর আমি তো মূল্য পেয়েও তার দাম দিতে পারি না ।
- কার দাম?
- শোন তবে
-হুম বলো।
- আমি ফুলমণি। মা মরা মেয়ে। বাপ অভাবে আমায় সোনাগাছিতে বেচে দিয়েছিল। ওখানেই বড়ো হয়েছি।ওখানেই আলাপ হয় রবির সাথে। তোর মতোই ঘুমোতে এসেছিল। ওই আমাকে ওখান থেকে নিয়ে এসেছিল। বিয়ে করে তোলে এখানে। তারপর থেকে আমি বদলাতে চেষ্টা করি। সভ্য সমাজের সাথে অভ্যস্ত হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এই দারিদ্র্যতা আমাকে আবার বেশ্যা বানিয়ে দিল। জানিস, রবি যা টাকা পায় আমার হাতে তুলে দেয়। এমনকি নেশাতেও ওড়ায়না টাকা। কিন্তু যখন দেখি রবি সারাদিন খাটার পরে চোখে জল নিয়ে রোজ একই নুন ভাত খায় তখন খুব কষ্ট হয়। রবি মাছ খেতে খুব ভালোবাসে কিন্তু সবকিছুই বিসর্জন দিতে হয়েছে। আমায় কে কাজ দেবে বল। তাই যে কাজে টাকা পাবো সেটাই আবার শুরু করি...
অভিও কখন শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছে। ফোনের নোটিফিকেশনে তখনও রয়েছে আনসিন করা ম্যাসেজ "শুনলাম মোহরের এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে অফিস কলিগের সাথে... "
***********************************************
-কোথায় যাবেন বাবু?
- ঐ বাজারের পিছনের বস্তিটায়।
-বসুন বাবু। ভালোই হলো আমারও ঘর ওখানেই। একবার দেখা করে আসতে পারবো বউয়ের সাথে...
-...
- এই যে বাবু । কার বাড়ি যাবেন বলুন?
- ঐ ঐ নীল দরজার সামনে দাঁড়ান ...
-এটা তো আমার ঘর বাবু। আপনি কার সাথে দেখা করবেন?
-ফুল...ফুলমণি...
-দাঁড়ান। ফুল... ফুল... একবার বাইরে আয় দেখি ... তোর সাথে কে দেখা করতে এসেছে...
বাবু আপনার নামটা?
-অভি
ঠিক এই সময় রমেশ হাজির হয়। রমেশ বলে " কিরে বলেছিলাম না তোর বউ আবার বেশ্যা হয়ে গেছে। রোজ দুপুরে তুই থাকিসনা সেই সুযোগে খদ্দের আনে। আর এই ছেলেটা তো বেশ কয়েকদিন ধরেই আসছে। তোর বউ ভদ্রলোকের সাথে শুতে পারে আর আমি শুতে চাইলেই দোষ? "
ফুল ততক্ষণে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু নিজের স্বপক্ষে কিছু বলার আগেই রবি চলে যায়। তারপর আর তার খোঁজ পাওয়া যায় নি। অভিকেও আর কেউ বস্তিতে আসতে দেখেনি। ফুল আবার ফিরে গেছে ফেলে আসা জীবনে । কে জানে রমেশই হয়ত ফুলের প্রথম খদ্দের...
Follow us on :
Facebook page :
Instagram :
Twitter :

সবটা বেশ সুন্দর ছিল। তবে শেষটা জমল না রে।
ReplyDelete