পুরানো ছন্দে নতুন গোয়েন্দাগল্প



-হ্যালো মিস্টার মিত্তির ...
-মিত্র। প্রদোষ মিত্র।
- সরি সরি আমারই উচ্চারণের ভুল। কিন্তু আমি যে বড়ো বিপদে পড়ে আপনাকে ফোন করেছি।
-আপনি যদি আমাকে পরিস্কার করে সব বলেন তাহলে সুবিধা হয়...
- আমি আপনার বন্ধু অজিত বাবুর মামার প্রতিবেশী কমলেশ্বর চ্যাটার্জী বলছি। অজিত বাবুর মামা আমার বন্ধু হয়। ওনার কাছে আপনার অনেক কথা শুনেছি। আপনি যদি একবার আমার বাড়ি আসেন তো ভালো হয়।
-আচ্ছা আমি বিকালে অজিতকে নিয়ে আপনার বাড়ি যাবো।
-আপনি এলে আমি খুব উপকৃত হবো ...

প্রদোষ ফোন রেখে সোফায় বসে খবর কাগজ হাতে তুলে নিল। ঠিক এমন সময়ে অজিত বসার ঘরে ঢুকলো।
- কী হে বন্ধু, কী খবর?
-তোমার মামার প্রতিবেশী কমলেশ্বর চ্যাটার্জী ফোন করেছিলেন এই মাত্র।
- কী বলল বুড়ো?
-বললেন খুব বিপদে পড়েছেন। একবার যেন ওর বাড়ি আমরা যাই।
-দ্যাখো তোমার নাম প্রদোষ হতে পারে আর আমার নাম অজিত হতে পারে। কিন্তু সত্যজিৎ রায় আর শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় যে লেভেলের গল্প লিখেছেন সেরকম কেস আমরা জন্মে পাবোনা।
-ব্যপারটা ছোটখাটো নয়। খবরের কাগজ বলছে ওনার বাড়ির কাজের লোক খুন হয়েছে আর ওনার বড়ো ছেলের ওপর সন্দেহের তীর রয়েছে।
-কিন্তু...
-এবার বাকি ঘটনাটা ওখানে গেলেই জানা যাবে...

বিকালে ট্যাক্সি করে প্রদোষ আর অজিত ভবানীপুরে কমলেশ্বর বাবুর বাড়ি উপস্থিত হলো। বেল বাজানো মাত্রই একজন মধ্যবয়সী মহিলা দরজা খুলে দিলেন। দুজনকে সোফায় বসতে বলে ভিতরে যাচ্ছিলেন কমলেশ্বর বাবুকে ডাকতে এমন সময় কমলেশ্বর বাবু নিজেই বসার ঘরে প্রবেশ করেন।

-আপনারা আসায় আমি যে কতটা নিশ্চিন্ত হয়েছি বলে বোঝাতে পারবোনা। আপনারই পারেন সত্যিটা বের করতে। আর আমি বাড়ির ব্যপার খুব একটা রাষ্ট্র করতে চাই না বলেই আপনাকে আরও ডাকলাম। চিন্তা করতে হবে না উপযুক্ত পারিশ্রমিক আপনারা পাবেন।
-আপনি আমাদের সবটা বলুন। তবে আমরা সাহায্য করতে পারবো...

কমলেশ্বর বাবু যা বললেন তাতে জানা গেল খুন হয়েছেন ওনার বাড়ির সব থেকে পুরানো ভৃত্য রামপাল। খুনের সন্দেহ ওনার বড়ো ছেলে অখিলেশের ওপর গেছে। অখিলেশ প্রায় দশ বছর আগে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। উনি গানের জগত বেছে নিয়েছিলেন কিন্তু বাবার তাতে মত ছিল না। তাই তিনি গৃহত্যাগী হন। খুনের দিন সকালে হঠাৎ তিনি ফিরে এসে ক্ষমা চান বাবার কাছে। তারপর সবই ঠিক ছিল। পরদিন সকালে রান্না ঘরে রামপালের মৃতদেহ পাওয়া যায়। গলায় গিটারের তার জড়ানো ছিল। পুলিশের অনুমান তার দিয়ে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়েছে। এই দৃশ্য প্রথম দেখে কমলেশ্বর বাবুর মেয়ে। বাড়ির সবাইকে ডাকতে গিয়ে দেখেন অখিলেশ বাবু ঘরে নেই। তারপরই ধরে নেওয়া হয় অখিলেশ বাবুই খুনি।

 - আজ অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। কাল আসবো। আপনার বাড়ির সবার সাথে একটু কথা বলবো। কাল তো রবিবার। আশা করি সবাই বাড়িতে থাকবেন।
-হ্যাঁ আমি সবাইকে থাকতে বলে দেবো।


প্রদোষ আর  অজিত ট্যাক্সি করে বাড়ি ফিরে এলো। প্রদোষ একবার থানায় ফোন করলো। ওসি অরূপ বিশ্বাস প্রদোষের বন্ধু। ফোন করে রামপালের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট চাইতেই জানতে পারলো কেসটার দায়িত্বে আছে কমলেশ্বর বাবুর বড়ো জামাই। প্রদোষ ফোনটা রেখে সিগারেট ধরালো।
-কী বুঝছো প্রদোষ?
-এখনও অবধি কিছুই না...

পরদিন সকালে প্রদোষ আর অজিত কমলেশ্বর বাবুর বাড়ি হাজির হলো। কমলেশ্বর বাবুর কথায় জানতে পারলো বাড়িতে মোটে তিনটে ঘর। নিচে রামপাল আর অখিলেশ বাবুর ঘর। আর ওপরের তলায় কমলেশ্বর বাবু আর তার বড়ো মেয়ে ও ছোটো ছেলের ঘর।

ওরা প্রথমে রামপাল আর অখিলেশ বাবুর ঘরটা দেখে নিল। অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। অখিলেশ বাবুর ঘরের এক কোণে চোখ পড়তেই প্রদোষ দেখতে পেল একটা গিটার যার ওপর বহু বছরের ধূলো জমা পড়ে আছে। কাছে গিয়ে দেখলো গায়ে লেখা১৯৯৮।

এরপর ওরা গেল ছোটো ছেলের ঘরে ...
-আপনি খুনের দিন রাতে কোথায় ছিলেন?
-আমি আর আমার স্ত্রী শপিং এ গেছিলাম। বাইরেই ডিনার করে বাড়ি ফিরেছিলাম। খুব ক্লান্ত ছিলাম বলে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পরের দিন দিদির ডাকে ঘুম ভাঙে।
-আচ্ছা। আপনি ও মনে করেন আপনার দাদা খুনটা করেছে?
- মনে করার কি আছে? ও ছাড়া কে করবে? জামাইবাবু তো খুঁজছে ওকে। পেলেই সব জানা যাবে ...

কমলেশ্বর বাবুর মেয়ে রান্না ঘরে রান্না করছিলেন।
-আপনি ঐ দিন রাতে কী করছিলেন?
-আমি খাওয়াদাওয়ার পর বাবার পায়েশটা বাটিতে দিয়ে ঘরে চলে যাই। ঘরেই ছিলাম তারপর।
-আপনার স্বামী তো পুলিশ। উনি কোথায় ছিলেন?
-ঘরেই ছিলেন। তারপর একটা ফোন আসায় ঘরের বাইরে চলে যান। অনেকক্ষণ পরে এসে বলেন একটা কেসের জন্য বেরোতে হবে। বেড়িয়ে যান আর ফেরেন ভোর রাতে।
-আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি?
-হ্যাঁ বলুন।
-আপনি বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও বাপের বাড়িতে...
-আসলে ওর পোস্টিংটা ভবানীপুরে হওয়ার পর বাবা নিজেই বলেছিলেন এখানে থাকতে।
-আচ্ছা.. .
-প্রদোষ বাবু একটা কথিত বলার ছিল। জানিনা কে কেন খুন করেছে। তবে দাদা খুন করতে পারে না। যে একটা মশা মারতে ভয় পেত সে মানুষ মারতে পারবে না। 
-আমরা সত্য উদঘাটনেরই চেষ্টায় আছি। 

প্রদোষ কমলেশ্বর বাবুর ঘরে ঢুকে দেখে টেবিলের ওপর পায়েশের বাটিটা  ভর্তি পড়ে আছে।
-মনের দুঃখে কি পায়েশটাও খাননি?
-আসলে রামপাল রোজ রাতে দুইটি পায়েশ নিয়ে ঘরে ঢুকতো। আমার মেয়েই বানিয়ে দিত। আমার আর রামপালের জন্য। আমারটা চিনি ছাড়া। কিন্তু রোজই রামপালকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে  চিনি ছাড়াটা খাওয়াবার। আর আমি চিনি দেওয়া খেতাম। এখন এই চিনি ছাড়াটা কে খাবে? তাই পড়ে আছে।
(প্রদোষ একটু পায়েশ একটা প্লাস্টিকে নিয়ে নিল)
- আচ্ছা অখিলেশ বাবু কী কোনো গিটার নিয়ে এসেছিলেন?
-না তো...
-আচ্ছা এবার আসি আমরা। কিছু জানতে পারলে আবার আসবো।

বেরোনোর সময় দেখা হয়ে গেল বাড়ির বড়ো জামাইয়ের সাথে। কিন্তু প্রদোষ কিছুই বললো না।
পরের দিন অপূর্ব বিশ্বাস কয়েকটা কাগজ নিয়ে ঢুকলো।
-এসো এসো অপূর্ব। কতদিন পর আমার বাড়িতে পা পড়লো।
-তোমার তো আমায় প্রয়োজনই পড়ে না। এই নাও রামপালের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আর পায়েশর রিপোর্ট।

রিপোর্টটা দেখে প্রদোষ বলে উঠলো "অজিত আজ রাতেই খুনি ধরা পড়বে। অপূর্ব তুমি গোটা টীম নিয়ে দশটা নাগাদ কমলেশ্বর বাবুর বাড়িটা ঘিরে ফেলবে।ও বাড়ির কেউ যেন জানতে না পারে। এমনকি ও বাড়ির জামাতাও  না... "

দশটার সময় প্রদোষ আর অজিত কমলেশ্বর বাবুর বাড়ি পৌঁছে গেলেন। কমলেশ্বর বাবুর ঘরে ঢুকে ওরা দেখলো আমিত মানে ওনার বড়ো জামাই পায়েশের বাটি হাতে ধরে বলছেন "এভাবে কী করে চলবে বাবা? আমি জানি আপনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। কিন্তু সত্যি তো এটাই অখিলেশ ই খুনি। আমরা তো খুঁজছি ... "
প্রদোষ বলে উঠলো
-কী করে খুঁজে পাবেন? যখন নিজেই অখিলেশ বাবুকে সরিয়ে দিয়েছেন...
-কী বলছো প্রদোষ!!! ও এ বাড়ির জামাই আর পুলিশ অফিসার।
- ওই রামপালের খুনি। আমি বলবো না আপনি নিজেই বলবেন অমিত বাবু?
....
রামপালকে শুধু শ্বাসরোধ করে মারা হয়েছে তাই নয়। পোস্টমর্টেমে জানা গেছে রামপালকে দিনের পর দিন বিষ দেওয়া হতো।
-কিন্তু রামপালকে কেন বিষ দেবে?
-আসলে বিষ পান আপনার উদ্দেশ্যে দেওয়া হতো। কিন্তু ভাগ্যবশত পায়েশটা খেত রামপাল। সেদিন যখন অমিত বাবু বিষ মেশাচ্ছিলেন তখন রামপাল দেখে ফেলে। তখন অমিত বাবু রামপালকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেন। রামপালকে যখন মার ছিলেন তখন অখিলেশ বাবু ওখানে কোনোভাবে চলে আসেন। তাকে কীভাবে সরিয়েছেন সেটা অমিত বাবুই জানেন। যেহেতু অমিত বাবু নিজেই পুলিশ তাই সবটা ধামাচাপা দিতে বেশি পরিশ্রম করতে হয়নি। অখিলেশ বাবুর গিটারটা পর্যন্ত দেখা হয়নি যেটার সবকটা তার অক্ষত রয়েছে। এমনকি পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কেও অগ্রাহ্য করা হয়েছে। পুলিশ হওয়ার ভালোই সুবিধা নিয়েছেন অমিত বাবু...
-এসব কী অমিত? আমি তো তোমায় নিজের ছেলের মতো দেখেছি ...
- উনি এখনও আপনার পায়েশে বিষ মেশান। সেটা কালকের পায়েশের রিপোর্টৈই পরিস্কার হয়ে গেছে...
আর কিছু বাকি আছে অমিত বাবু?সম্পত্তির লোভ পুলিশকেও খুনি বানিয়ে দেয়।
অপূর্ব এবার আসতে পারো তুমি...

পুলিশ এসে অমিত বাবুকে নিয়ে যায়। কমলেশ্বর বাবু প্রদোষের হাতটা ধরে বলেন
-আপনার জন্যই জানতে পারলাম কার সাথে বাস করছি। কিন্তু আমার ছেলে?
-সেটা তো পুলিশের কাজ অমিত বাবুর থেকে বের করা। আজ আমরা আসি। অনেক রাত হয়ে গেছে। ট্যাক্সি পাবোনা উবের ই করতে হবে মনে হয়। আবার একদিন আসবো না হয়। 

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

মুক্তি

ফুলমণি